
একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে এখনো সুবিচারের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন মা মোর্শেদা বেগম। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন সফল হওয়ার পর ৫ আগস্ট টাঙ্গাইল শহরে বিজয় মিছিল চলাকালে শহরের মেইন রোডে (সদর থানার সামনে) পুলিশের গুলিতে নিহত হন দশম শ্রেণীর ছাত্র মারুফ মিয়া। ওই বছরের ১৮ আগস্ট নিহতের মা বাদী হয়ে টাঙ্গাইল সদর থানায় ৫৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ১৫০-২০০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। তবে ঘটনার প্রায় দুই বছর পার হতে চললেও পুলিশ এখনো তদন্ত প্রতিবেদন বা চার্জশিট দাখিল করতে পারেনি। এতে নিহতের পরিবারসহ জেলার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অপরদিকে সরকারি আইন বিভাগ জানিয়েছে, সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতেই চার্জশিট দিতে বিলম্ব হচ্ছে।
টাঙ্গাইল শহরের সাবালিয়ায় ছোট্ট একটি টিনের ঘরে শহীদ মারুফের ছবি বুকে নিয়ে আহাজারি করছেন মা মোর্শেদা বেগম। প্রবাসী বাবার স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি ছিলেন মারুফ। বড় হয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে দেশের সেবা করার স্বপ্ন ছিল তাঁর। কিন্তু ৫ আগস্টের মিছিলে ডান কানে গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁর সেই স্বপ্ন থেমে যায়। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পরিবারটি এখন দিশেহারা; প্রবাসে থাকা বাবাও শোকে ঠিকমতো কাজ করতে পারছেন না।
শহীদ মারুফের মা মোর্শেদা বেগম বলেন, আমার একমাত্র সন্তান ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট টাঙ্গাইল সদরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। ১৮ আগস্ট আমি মামলা করলেও আজ পর্যন্ত কোনো চার্জশিট দেওয়া হয়নি, বিচারও পাইনি। আমরা সরকারের কাছে বিচার চাই-শুধু আমার ছেলের নয়, সারা দেশের সকল শহীদের হত্যার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা হোক।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) টাঙ্গাইল জেলা আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান শাওন বলেন, চব্বিশের গণ-আন্দোলনে ৫ই আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পলায়নের পর টাঙ্গাইলে সংঘর্ষের সময় মারুফ মিয়া নিহত হন। ওই মাসেই মামলা দায়ের করা হলেও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে আজ পর্যন্ত চার্জশিট দেওয়া হচ্ছে না। সরকারের কাছে আমাদের জোর দাবি-অবিলম্বে এই মারুফ হত্যা মামলার চার্জশিট প্রদান করা হোক। যে মায়ের বুক খালি হয়েছে, কেবল তিনিই সন্তান হারানোর যন্ত্রণা বুঝতে পারেন। আমরা মারুফসহ সকল জুলাই শহীদের বিচার চাই।"
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) টাঙ্গাইল জেলা সদস্য সচিব মাসুদুর রহমান রাসেল বলেন, টাঙ্গাইলে মোট ৯ জন শহীদ হয়েছেন। শহরে যখন আনন্দ মিছিল হচ্ছিল, ঠিক তখনই মারুফ শহীদ হয়। পুলিশ তাকে গুলি করার ভিডিও কালেকশন করে আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও প্রশাসনকে দিয়েছি। এরপরও দুই বছর ধরে চার্জশিট আটকে থাকাটা কষ্টদায়ক। আমরা দেখি অন্যান্য মামলা থেকে আসামিদের বাদ দেওয়ার বা কাটছাঁট করার চেষ্টা হয়, এই মামলাতেও তেমনটি হচ্ছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ১ হাজার ৪শত শহীদ ও ৩০ হাজার আহতের বিচার না করে কেবল অর্থ বা পুনর্বাসন দিয়ে সান্ত্বনা দেওয়া সম্ভব নয়। ক্ষমতার রেজিম পরিবর্তন হলেও প্রকৃত পরিবর্তন বা সুবিচার এখনো হয়নি।"
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন টাঙ্গাইল জেলা সমন্বয়ক ফাতেমা রহমান বিথী বলেন, আমরা সবাই প্রত্যক্ষদর্শী যে মারুফকে টাঙ্গাইলের পুলিশ হত্যা করেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, মামলায় কোনো পুলিশের নাম সরাসরি লেখা হয়নি। আমরা চাই মারুফসহ ৯ জন শহীদের প্রকৃত হত্যাকারীদের চিহ্নিত করা হোক এবং বাংলাদেশের মাটিতে, জনগণের সামনে তাদের বিচার নিশ্চিত করা হোক।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন টাঙ্গাইল জেলা আহ্বায়ক আল আমিন বলেন, টাঙ্গাইলে গণঅভ্যুত্থানে ৯ জন শহীদ ও প্রায় ২৭০ জন আহত হয়েছেন। সদর স্পটে একমাত্র মারুফ মিয়াই শহীদ হন। দুই বছর অতিক্রম হতে চললেও তাঁর মামলার চার্জশিট ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে। আমরা ছাত্রসমাজ বারবার শহীদ মারুফ ও শহীদ ইমনের মামলার চার্জশিট দ্রুত দাখিল করে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরুর দাবি জানিয়ে আসছি এবং এই পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ান আবেদন জানাচ্ছি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন টাঙ্গাইল জেলা প্রধান সমন্বয়ক মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, মারুফের বিচার শুধু তাঁর পরিবার নয়, আমরা দেশের প্রতিটি মানুষ চাই। এতদিনেও চার্জশিট না দেওয়াটা সবচেয়ে বড় কষ্টের বিষয়। সরকারের কাছে দাবি-খুব দ্রুত প্রত্যেকটি মামলার চার্জশিট প্রকাশ করা হোক, আসামীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা হোক এবং প্রকৃত দোষীদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো হোক।
টাঙ্গাইলের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম রিপন বলেন, মামলাটিতে এজাহারনামীয় ৫৬ জন ছাড়াও ১৫০ থেকে ২০০ জন অজ্ঞাত আসামি রয়েছে। এতগুলো আসামির সঠিক পরিচয়, নাম ও ঠিকানা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করতে একাধিক আইনি ধাপ অতিক্রম করতে হচ্ছে। সরকার ও আমরা প্রসিকিউশন টিম অপরাধীদের বিচারে অঙ্গীকারবদ্ধ, তবে তদন্তে গিয়ে যেন কোনো নিরীহ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টিও দেখতে হচ্ছে। তদন্ত প্রক্রিয়ার কারণেই মূলত বিলম্ব হচ্ছে। অচিরেই নিরপেক্ষ তদন্ত শেষে চার্জশিট দাখিল হবে এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।